আপনি কি কখনো এই শব্দগুলো শুনেছেন ‘DEEP WEB’ বা ‘DARK WEB’?
মুলত আমরা এই ধরনের শব্দগুলো শুনে থাকি বিখ্যাত গোয়েন্দা মুভি এবং
টিভিশো গুলোতে।এটা হল এমন একটা টার্ম যা ব্যবহার করা হয় কিছু ওয়েবসাইটের
কালেকশানকে বোঝাতে যেগুলো বাস্তবে আছে কিন্তু প্রকৃতপক্ষে সেগুলো লুকিয়ে রাখা হয়
সাধারন মানুষদের থেকে।এই ওয়েবসাইট গুলো তাদের IP অ্যাড্রেসকে
গোপন রাখে এবং স্ক্রিনের সামনে যে আছে তার পক্ষে সেটা চিহ্নিত করা অসম্ভব করে দেয়।
আপনি কি মনে করেন যে আপনি কিছু সাধারন ব্রাউজার দিয়ে তাদেরকে খুজে বের করতে
পারবেন যেমন Chrome বা Firefox? না , কখনোই না।এমনকি
তারা গুগল বা ইয়াগু তেও নির্দেশিত নেই।
সুতরাং আপনি এসব ওয়েবসাইট থেকে যে কোন ধরনের বেআইনি জিনিস কিনতে পারবেন।আপনি এ
ধরনের ওয়েবসাইট থেকে একটা আগ্নেয়াস্ত্র কিনে একজনকে মেরে ফেলতে পারেন। একজনকে ভাড়া
করতে পারেন যে কিনা আপনার হয়ে কাউকে খুন করবে একটা ভুয়া পরিচয়ের মাধ্যমে। সুতরাং DEEP WEB হচ্ছে
একটা অন্ধকার জায়গা এবং আসুন জেনে নিই এখানে কি ঘটে চলে।
এটা কিভাবে কাজ করে?
DARK WEB এর প্রায় সকল ওয়েবসাইটেই TOR নামে এক ধরনের এনক্রিপসান টুল ব্যবহার করা হয়।এই TOR ই মুলত সেই সকল ওয়েবসাইটের জন্য ব্রাউজার হিসেবে কাজ করে। সুতরাং এই
ধরনের অনেক ওয়েবসাইটে আছে .tor নামক ডোমেইন যার অর্থ
সাধারন ব্রাউজার দিয়ে এই ওয়েবসাইট গুলোতে একসেস পাওয়া সম্ভব নয়। এই TOR আবার Onion Routing নামেও পরিচিত।এর কারন
হিসেবে বলা যায় ইন্টারনেট অনেকটা পিয়াজের মত যার অনেক স্তর রয়েছে।
TOR বা Onion Routing মুলত এক
ধরনের ফ্রি সফটওয়ার যা বানানো হয়েছিল United States Naval Research Lab দ্বারা যার মাধ্যমে
প্রেরকের নাম ঠিকানা গোপন করে যোগাযোগ স্থাপন করা যেত।
একটা তথ্য দিয়ে রাখা ভাল যে এই পৃথিবীতে ইন্টারনেটের
জগতে আনুমানিক ৮ মিলিয়ন ওয়েবসাইট আছে। এর মাঝে একটা চমক লাগানো ও মজার বিষয় হল Facebook, Google, Amazon এর মত যে সকল
ওয়েবসাইটের ডোমেইন হিসেবে HTTPS বা .com ব্যবহার করা হয় তা মুলত মোট ওয়েবসাইটের ৪% অংশ বহন করে। এবং এই ডিজিটাল
জগতের বাকি ৯৬% ওয়েবসাইট DEEP WEB টাইপের। এই ওয়েবসাইট
গুলোর নিরাপত্তা পাসওয়ার্ড দ্বারা নিশ্চিত করা হয় এবং যা তাদের মালিকরা পর্যন্ত
ট্রেস করতে পারেনা।
তবে Deep
Web এর সকল DARK ওয়েবসাইটই কিন্তু TOR এনক্রিপসান
ব্যবহার করে না।যেমন কিছু ওয়েবসাইট আছে Silk Road Reloaded এর মত যারা
I2P নামে
একই সার্ভিস চালু রেখেছে।Silk Road হল মুলত বিনোদন মুলক মাদক কেনাবেচার একটা ওয়েবসাইট।এটাই ছিল প্রথম আধুনিক কালবাজার যা বেশ আলোড়ন
তুলেছিল আর এর ফলে
সাম্প্রতিককালে এর মালিককে গ্রেফতার করে জেলে
দেয়া হয়েছে।
কেন এটাকে Deep Web বা Dark বলে ডাকা হয়?
Dark Website এর ব্যাপারে বলতে গেলে খুব উত্তেজনা এবং
হতবিহব্বলতা অনুভুত হয়।এই দুইটা কথাই একে অপরের সাথে সম্পর্কিত মনে হলেও এরা
আলাদা। Deep Web নামক কথাটা ব্যবহার করা হয় মুলত
‘Dark Web’ এর ভেতর অবস্থিত
সকল ওয়েবসাইটকে বোঝানোর জন্য। Deep Web এ সকল ধরনের ডাটা রয়েছে
যেগুলো মুলত বিরক্তিকর জাগতিক কারনে।
Dark Web যা মুলত Deep Web এর একটি অংশ। যাতে প্রবেশের জন্য বিশেষ কিছু টুল
এবং সরঞ্জাম দরকার হয়।এই ওয়েবসাইট গুলোকে সেট করা থাকে খুব গভীর আন্ডারগ্রাউন্ড এর
হিসেবে।এর প্রকৃতিগত কারনেই আমরা পরিমাপ করতে পারিনা আসলে ঠিক কত সংখ্যক এই ধরনের
ওয়েবসাইট রয়েছে যা মুলত ক্ষতিকর এবং ঘৃনিত বিষয়বস্তু দ্বারা পরিপুর্ন। এখানে এই
ধরনের কিছু ওয়েবসাইট দেয়া হল।
অনলাইন কালবাজারের যায়গাসমুহঃ
এই Deep Web এ সেই সকল ওয়েবসাইট গুলোতেই
মুলত সবচেয়ে বেশি প্রবেশ করা হয় যেগুলোতে অবৈধ মাদক,পাইরেট করা গেমস গুলো বিক্রি
করা হয়।ওয়েব রিপোর্ট অনুসারে লোকেরা এই সকল ওয়েবসাইটে প্রবেশ করে এবং নিচের মাদক
গুলো বেচাবিক্রি করেঃ
এই Deep Web মানুষদের এমন একটা প্লাটফর্ম
দেয় যার মাধ্যমে তারা গোপন ও অবৈধ কাজগুলোকে ছড়ানো ও সম্পাদন করার ব্যাপারে
লোকেদের উতসাহ দিতে পারে।সেখানে একটা সাইবার ক্রিমিনাল আন্ডারগ্রাউন্ড আছে যা
সমস্ত কাজ গুলো নিয়ন্ত্রন করে এবং পৃথিবীর জন্য এক মর্মান্তিক পরিবেশে সৃষ্টি করে।
Ross William
Ulbricht aka Dread Pirate Roberts হলেন Silk
Road প্রতিষ্ঠাতা।যিনি
পরবর্তিতে মানি লন্ডারিং,মার্ডার,কম্পিউটার হ্যাকিং,প্রতারনা সহ নানান ধরনের খারাপ
কাজের জন্য অভিযুক্ত হন।তার ওয়েবসাইট Silk Road হল সেই রকম একটা ওয়েব সাইট যা বিভিন্ন ধরনের
খারাপ কাজগুলোর ব্যাপারে লোকেদের সাহায্য করতো।
Drug-store
Deep Web এর মাধ্যমে অবৈধ মাদক এর সহজলভ্যতার প্রসার
হচ্ছে।এই রকম অনেক ওয়েবসাইট কোকেন,হেরোইন সহ আরো নানা ধরনের মাদক বিক্রি করে থাকে।
এছাড়াও এক ধরনের সার্চ ইঞ্জিন আছে যার নাম ‘Grams’ যা লোকেদের গাইডলাইন দেয় এবং অনুমতি দেয় এই সকল Deep Web সাইট গুলোদে সার্চ করতে এবং অবৈধ মাদক বিক্রি করতে।এমনকি তারা Google
এর লোগো কে নকল করেছে অন্য প্রতিযোগী ওয়েবসাইট গুলো থেকে নিজেকে
আলাদা করার জন্য।
মানি লন্ডারিং এবং জাল টাকা ছাপানোঃ
এই Deep Web এ মানুষদের তাদের ক্রেডিট
কার্ড বা ডেবিট কার্ড ব্যবহার করার দরকার নেই পন্য কেনাবেচার জন্য।এমনকি পেপালের
মত সার্ভিস গুলোও ব্যবহার করার দরকার নেই।এখানে এক ধরনের স্পেশাল এবং ভার্চুয়াল
মুদ্রা ব্যবস্থা রয়েছে যার নাম ‘Bitcoin’। এটাই পেমেন্টের প্রধানতম
সিস্টেম।এর ফলে ব্যবহারকারীদের পরিচয় গোপন রাখা সম্ভব হয়।ব্যাংক ও সরকারের কাছ
থেকে নিজেদের কাজকর্মকে ধরাছোয়ার বাইরে রাখার জন্য এই পদ্ধতিটা হচ্ছে একটা আদর্শ
পদ্ধতি।
Deep Web এ আবার এমন কিছু কঠিন সার্ভিস আছে যা অথরিটির
পক্ষেও আপনার Bitcoin লেনদেন ট্র্যাক করা কঠিন করে
দিবে। এই সার্ভিস গুলো আপনার Bitcoin গুলোকে spidey
network এর সাথে মিশিয়ে দিবে এবং তা পরবর্তিতে আপনাকে ফেরত
দিবে।অবশ্যই এই সার্ভিস গুলো আপনাকে এই সুবিধা প্রদানের জন্য কিছু প্রসেসিং ফি
আপনার কাছ থেকে নিবে কিন্তু আপনাকে ট্র্যাক করা কঠিন করে দিবে।
Easy-coin:
Bitcoin কে আবার ক্যাশ করা যাবে।Deep Web এ ভুয়া মুদ্রা ব্যবস্থার একটা সহজলভ্যতা পরিলিক্ষিত হয়।এই ভুয়া ক্যাশ
খোলাবাজার এর মত বা অর্ডার বেসিসে কেনা যায়।তারা আসলে দেখতে হুবুহু আসল টাকার মত
এবং ১০০% সুতি লিনেন কাগজ দিয়ে তৈরি। আমাদের ব্যবহৃত মুদ্রাও মুলত এই একই কাগজ দিয়ে
বানানো হয়। এই ধরনের টাকাগুলো কিন্তু infrared স্ক্যানারের
সাহায্যে ধরে ফেলা সম্ভব।কিন্তু তার পরেও লোকেরা এই ধরনের অসুরক্ষিত লেনদেনকে ভয়
পাচ্ছেনা।এই ওয়েবসাইট গুলো পন্যের মুল্য অর্ধেক করতে ২০$ প্রদান
করে এবং অন্যন্য ওয়েবসাইট গুলোও ইউরো বা ইয়েন প্রদান করে।
আগ্নেয়াস্ত্রঃ
Carnegie Mellon University এর রিসার্চ মতে Dark
Web এ সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয় মাদক। MDMA এবং Marijuana হল সবচেয়ে বেশি বিখ্যাত বিক্রি হওয়া আইটেম।তাওপরেও আগ্নেয়াস্ত্র এবং
অন্যান্য অস্ত্র গুলোও কিন্তু ভালই বিক্রি হয়।এখানে এক ধরনের ওয়েবসাইট আছে নাম ‘Armory’।এখান থেকে
লোকেরা সব ধরনের অবৈধ অস্ত্র এবং গোলাবারুদ কিনে থাকে।শুধু তাই নয় এই সব অস্ত্র
পরে সারা দুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে।
এই ওয়েবসাইট গুলোই মুলত যথাযথ কতৃপক্ষের জন্য বিষয়গুলো
ভাল ভাবে মনিটরিং করাকে কষ্টসাধ্য করে দিচ্ছে।
পাসপোর্ট এবং নাগরিকত্বঃ
একজন আমেরিকান নাগরিক বা EU নাগরিক হওয়া আপনার
জন্য সত্যিই খুব বড় ব্যাপার।এই ওয়েব সাইট গুলো আপনাকে এই সমস্ত দেশে ভ্রমন ও
নাগরিকত্ব সুবিধা পাবার ক্ষেত্রেও অবৈধ সুযোগ সৃষ্টি করে দিচ্ছে।শুধু আপনাকে
বর্ডার ক্রস করার ডকুমেন্ট গুলো দিয়েই ক্ষান্ত হচ্ছে তা নয়।এমনকি তারা আপনাকে
ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা,লোনের জন্য আবেদন,সম্পত্তি কেনা বা প্রাদেশিক সুবিধা সমুহ
পাবার ক্ষেত্রেও যাবতীয় সাহায্য করছে।এবং সমস্ত ডকুমেন্ট গুলোই ভুয়া এবং এই সমস্ত
ওয়েবসাইট থেকে কেনা।
Silk Road এর প্রতিষ্ঠাতা Dread Pirate Roberts ধরা পড়েছিলেন মুলত এই কারনে যে উনি কিছু ভুয়া আইডি Deep Web এ অর্ডার করেছিলেন নিজের
প্রকৃত পরিচয় FBI এর কাছ থেকে গোপন করার জন্য।পরবর্তিতে FBI
তাকে ধরতে সক্ষম হয়েছিল বটে কিন্তু তার কাছে থেকে যে ডকুমেন্ট
গুলো পাওয়া গিয়েছিল তা হুবুহু আসল ডকুমেন্টের মতই।
শিশু পর্নগ্রাফিঃ
শিশু পর্নগ্রাফি এক ধরনের জঘন্য অপরাধ যা বর্তমানে ঘটে
যাচ্ছে যাকে অবশ্যই থামাতে হবে।আপনি শুধু এতটুকু নিশ্চয়তা দিন যে আপনি নিজে এই Dark Web এর এই ভয়াবহ কর্মকান্ড গুলো ছড়াবেন না।
অবশেষে এটা বলে শেষ করতে চাই যে এই Deep Web টা আবিষ্কার করা হয়েছিল কিছু চাহিদা পুরন করার জন্য। যেমন স্বাধীনতা এবং
গোপনীয়তা কে রক্ষা করার জন্য।সাধারন মানুষেরা এটা ব্যবহার করেছে মিশরের সংকট কালীন
সময়ে।এটা কোন ভাবেই অস্বীকার করা যাবেনা যে এই Deep Web এর ব্যবহার খারাপ কাজের চেয়েও ভাল কাজে বেশি করে
লাগানো যেতে পারে।

Comments
Post a Comment